বাজেট বুঝি না, ডাল-ভাতের দামটা বুঝি”-রাস্তার ধারের ছাপড়ি দোকানে বসেই জীবনের গল্প বললেন ফাইজুল
বাজেট বুঝি না, ডাল-ভাতের দামটা বুঝি”-রাস্তার ধারের ছাপড়ি দোকানে বসেই জীবনের গল্প বললেন ফাইজুল
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের বির্তুল গ্রামের এক ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট্ট একটি ছাপড়ি ঘর। চারপাশে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে ঘেরা, মাথার ওপর পাটখড়ির ছাউনি। ভেতরে কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ। বাহ্যিক চাকচিক্য নেই, নেই কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া। তবু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই এখানে জড়ো হন পথচারী, শ্রমিক, চালক আর নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কারণ, এই ছোট্ট দোকানেই মেলে গরম গরম পিঠা, ছোলা, পিয়াজু আর সেদ্ধ ডিম। এই দোকানের মালিক পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. ফাইজুল হোসেন। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত দোকানে বসে নিজ হাতে ক্রেতাদের আপ্যায়ন করেন। তার প্রধান সহযোদ্ধা স্ত্রী মোসলেমা খাতুন।
দু'জনে মিলে জীবনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর। সাদা শার্ট, পরিপাটি লুঙ্গি, কাঁচা-পাকা দাড়ি ও চুলে মেহেদির রঙ-প্রথম দেখায় তাকে সাধারণ একজন দোকানি মনে হলেও, তার জীবনের গল্প মোটেও সাধারণ নয়। কথা বলতে বলতে ফাইজুল হোসেন ফিরে যান অতীতের স্মৃতিতে। জানালেন, প্রথম স্ত্রীকে হারিয়েছেন অনেক আগেই। রেখে গেছেন দুই সন্তান।
তাদের একজন পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পদে উত্তীর্ণ হয়েও চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ। সেই স্মৃতি এখনও বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটায় বাবার। অন্য ছেলে বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছেন। পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন ফাইজুল। বর্তমান সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে আছেন শ্বশুরবাড়িতে। আর ছেলে তাদের সঙ্গেই থাকে, চালায় ইজিবাইক। এখন ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছেন বাবা-মা। একসময় দিনভর রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন ফাইজুল। শ্রমই ছিল জীবনের ভরসা। কিন্তু বয়স ও অসুস্থতা তাকে সেই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরাও আর ভারী কাজ করতে দিতে চান না। এমনকি রাস্তার পাশে দোকান করাতেও আপত্তি ছিল পরিবারের। তবু সংসারের দায় তাকে বসিয়ে রেখেছে এই ছোট্ট দোকানে। শীতকালে ব্যবসা কিছুটা ভালো চলে।
তখন প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার বিক্রি হয়। কিন্তু এখন মৌসুম বদলেছে। বিক্রি নেমে এসেছে এক হাজার দুইশ থেকে দেড় হাজার টাকায়। সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকে মাত্র চার থেকে পাঁচশ টাকা। হাসিমুখে তিনি বলেন, “কষ্ট হয়, কিন্তু আল্লাহর রহমতে কোনোমতে চলে যায়।” কথা ঘুরে যায় সমাজের প্রসঙ্গে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইজুল হোসেন বলেন, “সমাজটা মাদকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরুণরা যেভাবে মাদকাসক্ত হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় লাগে। আবার মোবাইল ফোনও অনেককে পথভ্রষ্ট করছে।” দেশের অর্থনীতি, বাজেট কিংবা উন্নয়নের বড় বড় হিসাব-নিকাশ নিয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। তবে একজন সাধারণ মানুষের ভাষায় তিনি তুলে ধরেন বাস্তবতার নির্মম চিত্র। “বাবা, আমরা বাজেট-টাজেট কিছু বুঝি না। গরিব মানুষ। ডাল-ভাত খেয়ে, পরে কোনোমতে বেঁচে থাকতে পারলেই হলো। আমাদের কাছে বাজেট মানে বাজারের জিনিসপত্রের দাম। দাম যেন হাতের নাগালে থাকে, এটাই চাই।” ফাইজুল হোসেনের এই কথাগুলো যেন দেশের লাখো নিম্নআয়ের মানুষের মনের ভাষা। অর্থনীতির জটিল পরিসংখ্যান, উন্নয়নের বিশাল অঙ্ক কিংবা বাজেটের বিশ্লেষণ তাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-দিনের শেষে পরিবারের জন্য দু'মুঠো খাবার জোগাড় করা যাবে কি না।
রাস্তার ধারের সেই ছোট্ট ছাপড়ি দোকানে বসে ফাইজুল হোসেন শুধু পিঠা-পিয়াজু বিক্রি করেন না; তিনি প্রতিদিন লড়াই করেন জীবন নামের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে। আর তার গল্প হয়ে ওঠে এই দেশের সাধারণ মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার এক জীবন্ত দলিল।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স